ইসলামে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা

ইসলামে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা রক্ষায় নানাবিধ বিষয় শেখানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ [মুসলিম : ২২৩]
ইসলামে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সামগ্রিক। পরিচ্ছন্নতা বলতে শরীর ও মনের পরিচ্ছন্নতাকে বোঝানো হয়ে থাকে। একজন মুসলিমের পরিচ্ছন্নতার বিভিন্ন দিক খেয়াল রাখতে হয়। সুস্থ শরীর-মন ও সুস্থ চিন্তার জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশ। ঘরবাড়ি, আঙিনা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি পরিবেশেরই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট, খোলা মাঠ আবর্জনামুক্ত রাখা একান্ত প্রয়োজন। খাদ্য ও পানীয় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র না রাখলে এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি।
কুরআন ও সুন্নায় পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আরও ব্যাপক শব্দ ‘তাহারাহ’ তথা পবিত্রতা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ‘তাহারাহ’ শব্দ যেমন কুফরী ও বিধার্মিকতা থেকে নিয়ে যাবতীয় পাপাচারের মতো আভ্যন্তরীণ নোংরামি থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে, তেমনি তা সবরকমের বাহ্যিক অপরিচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। বাহ্যিক পবিত্রতা একজন মুমিনের সালাত শুদ্ধ হবার পূর্বশর্ত। যেমন ‘হাদছ’ তথা অবস্তুগত অপরিচ্ছন্নতা থেকে পবিত্র হতে হয় অযু বা গোসল দ্বারা তেমনি ‘খুবুছ’ তথা বস্তুগত অপরিচ্ছন্নতা থেকেও পবিত্র হতে হয় দেহ, বস্ত্র ও স্থান পরিষ্কারের মাধ্যমে। এ কারণেই ইসলামে ফিকহ শাস্ত্রের সকল গ্রন্থে প্রথমেই ‘কিতাবুত-তাহারাহ’ তথা পবিত্রতা অধ্যায় স্থান পেয়েছে।
পবিত্র কুরআনের দিকে চাইলে আমরা দেখি, কোবাবাসীর প্রশংসা করেছেন আল্লাহ তা‘আলা অধিক পবিত্র হবার মানসিকতার জন্য। ইরশাদ হয়েছে: ‘অবশ্যই যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার ওপর প্রথম দিন থেকে তা বেশি হকদার যে, তুমি সেখানে সালাত কায়েম করতে দাঁড়াবে। সেখানে এমন লোক আছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালবাসে। আর আল্লাহ্ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।’ [সূরা আত-তাওবা, আয়াত : ১০৮]

-‘হে ইমানদারগণ, তোমরা যখন সালাত আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হও, তখন সালাতের পূর্বে তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাতগুলো কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নাও আর মাথা মাসেহ করো এবং পাগুলো টাকনু পর্যন্ত ধুয়ে ফেল। যদি তোমরা অপবিত্র হও, তাহলে গোসল করে পুরো শরীর পবিত্র করে নাও। কিন্তু যদি রোগগ্রস্ত হও কিংবা সফরে থাক অথবা কেউ পায়খানা হতে ফিরে আস কিংবা তোমরা স্ত্রীদের স্পর্শ করো, অতঃপর পানি না পাও, তাহলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও। তখন তোমরা তা দ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করো। আলল্গাহ তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আনয়ন করতে চান না, বরং তিনি তোমাদের পবিত্র করতে ও তোমাদের ওপর স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করতে চান; যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।'(আল মায়েদাঃ৬)

আল্লাহর জন্য প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য হলো (অন্তত) প্রতি সাত দিনের মাথায় তার মাথা ও শরীর ধৌত করা।’ [বুখারী : ৮৯৭; মুসলিম : ৮৪৯]

জুমার দিন (শুক্রবার) গোসল করা প্রতিটি সাবালক ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব।’ [বুখারী : ৪৭৯]

‘নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রকে পছন্দ করেন; আল্লাহ পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন; আল্লাহ মহৎ, তিনি মহত্ত্ব পছন্দ করেন; আল্লাহ বদান্য, তিনি বদান্যতা পছন্দ করেন। অতএব তোমরা তোমাদের (ঘরের) উঠোনগুলো পরিচ্ছন্ন রাখবে।‘ [তিরমিযী : ২৭৯৯]

‘তোমরা বাসন ঢেকে রাখো, পানপাত্রের মুখ বন্ধ রাখো, দরজা অর্গলাবদ্ধ করো এবং এশার সময় তোমাদের শিশুদের সামনে রাখো। কেননা এসময় জিনরা ছড়িয়ে পড়ে এবং আছর করে। আর তোমরা নিদ্রাকালে বাতিগুলো [প্রদীপসমূহ] নিভিয়ে দিও। কেননা ইঁদুর কখনো প্রদীপের সলতে টেনে নিয়ে যায়। অতঃপর তা গৃহবাসীকে জ্বালিয়ে দেয়।’ [বুখারী : ৩৩১৬]

‘দশটি বিষয় ‘ফিতরাতে’র অন্তর্ভুক্ত : গোঁফ কাটা, দাড়ি লম্বা রাখা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, চামড়ার ভাঁজের জায়গাগুলো ধৌত করা, বগলের নিচের চুল তুলে ফেলা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, (বাথরুমের প্রয়োজন পুরণের পর) পানি দ্বারা পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা। বর্ণনাকারী বলেন, দশম বিষয়টি আমি ভুলে গেছি, যদি না তা হয় ‘কুলি করা।’ [সহীহ মুসলিম : ২৭৫৭]

মহিলাদের মাসিক স্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার আলোচনা শেষে মহান আল্লাহ বলেন: ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ [সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২২২]

যদি না আমার উম্মত অথবা (তিনি বলেছেন) মানুষের জন্য কঠিন হত তবে আমি তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সঙ্গে মিসওয়াকের নির্দেশ (ওয়াজিব ঘোষণা) দিতাম।’ [বুখারী : ৮৮৭; মুসলিম : ২৫২]

চুলের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায়ও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘একদিন আমাদের বাসায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেড়াতে এলেন। এখানে এসে তিনি এক এলোকেশী ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। তার সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এ ব্যক্তি কি এমন কিছু জোটাতে পারে নি যা দিয়ে সে তার মাথার চুল বিন্যস্ত করবে’। আরেকজনকে তিনি দেখলেন ময়লা বস্ত্র পরিহিত। তার উদ্দেশে বললেন, ‘এ ব্যক্তি কি এমন কিছু জোগাড় করতে পারে নি যা দিয়ে সে তার কাপড় পরিষ্কার করবে।’ [মুসনাদ আহমাদ : ১৪৮৫০; বাইহাকী : ৫৮১৩]

Md Amir

সত্যকে খুঁজে বেড়াই। সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকি। আর তা অন্যদেরকে অনুপ্রেরণা দেবার চেষ্টা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!