আমি কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য ?

আমি কি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য  ?

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার নকল উপায় তোতা পাখির আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ, আওড়ানো। অনেকে এটা এতই কৃএিমভাবে করে, যে আলী (রাঃ) একবার একজনকে এমন করছে দেখে বললেন, ” তোমার ইস্তিগফারের জন্য ইস্তিগফার করা দরকার”।
কারন আপনার জীভ কতগুলো আরবি শব্দ আওড়াচ্ছে, আর কিছুই না।

আল্লাহর কাছে সত্যিকারের ক্ষমা চাইতে বাধা দেয় একটা জিনিস। নিরাশা।

কিছু মানুষ ধরেই নিয়েছে যে আমি অনেক খারাপ কাজ করেছি, আল্লাহ আমাকে খুব একটা পছন্দ করেন না। অনেকে আবার এমনও বলে, আমি নিজের কানে শুনেছি আল্লাহ আমাকে ঘৃনা করেন। আল্লাহ আমাকে দেখতে পারেন না। আল্লাহ আমার উপর রেগে আছেন। কারন আমি অনেক খারাপ কাজ করেছি। আমি জানতাম আল্লাহ চান না আমি এটা এটা করি, তাও আমি করেছি। বার বার করেছি। তাই ভালো মানুষের তালিকা থেকে আল্লাহ আমার কেটে দিয়েছেন। আমার প্রার্থনার কোন মূল্য নেই।

যখন কেউ এই রকম ব বিশ্বাস পোষণ করে তখন সে অন্যদের কি বলে জানেন? আমি খুব খারাপ মানুষ আপনি কি আমার জন্য দোয়া করতে পারবেন। কারন আমারতো ভালো মানুষের তালিকায় নাম নেই। আপনার নিশ্চয়ই আছে। তাই আপনি আমার হয়ে দোয়া করুন। আল্লাহ অন্তত আপনার কথা শুনবেন। তার সাথে আপনার ভাল সম্পর্ক। হয়তো এটাই আমার একমাত্র সুযোগ। কারন আল্লাহ আমার নিজের দোয়া কখনোই শুনবেন না।

চলুন নুহ (আঃ) এর কথায় যাই। তিনি কাদেরকে ক্ষমার প্রস্তাব দিয়েছিলেন? পৃথিবীর সবচেয়ে অবাধ্য জাতীগুলোর একটিকে। তারা লাগাতার আল্লাহর অবাধ্যতা করত। নুহ (আঃ) তাদেরকে বললেন তোমরা যদি ক্ষমা প্রার্থনা চাও তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমাতো করবেনই উপরন্ত তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর প্রাচুর্যের দরজা খুলে দিবেন।

মানে আপনি নিজের ব্যাপারে নিরাশ হতে পারেন না। আপনি নিজেকে বলতে পারেন না আমি খুব বেশি নিচে চলে গেছি। ক্ষমা প্রার্থনা আমাকে মানায় না। অন্যরা হয়তো পারে। কিন্তু আমার ক্ষমার দিন শেষ! আমি আশার অতীত। মা আমার জন্য দোয়া করলেও করতে পারে অথবা অমুক ভালো লোক আমার জন্য দোয়া করতে পারেন।

আর এখানে শয়তান এসে জুড়ে বসে। মানুষের হতাশার সুযোগ নিয়ে সে আরো খারাপ জিনিসের দরজা খুলে দেয়। সেটা কে জানেন? শির্ক। শয়তান নকল ধর্মগুলোকে নিয়ে এসে তাকে বলে, তুমি খুব বড় গুনাহগার। জিসাস (ঈসা আঃ) তোমাকে ক্ষমা করবেন। তুমি জিসাসের উপাসনা কর। তিনি তোমার হয়ে ইশ্বরের কাছে ওকালতি করবেন। অথবা অমুক পীরের কবরে যাও, তার কাছে প্রার্থনা করো। তার কবরের সামনে মন্ডা মিঠাই রেখে আসো। তাহলেই সে আল্লাহর কাছে তোমার সমস্যাগুলোর সমাধান চেয়ে নিবে। কারন তুমি খুব বড় গুনাহগার। তুমি সরাসরি আল্লাহর কাছে চাইতে পারো না। কিন্তু পীরসাহেব আল্লাহর কাছে সম্মানিয় তাই তার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে পৌছাতে পারবে।

এভাবেই শির্কের দরজা খুলে যায়। ইমান এবং তাওহিদের মূল তাৎপর্য হলো আল্লাহর সাথে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক। এটাই লা-ইলাহা ইল্লালাহ এর অর্থ। এর উদ্দেশ্য হলো আপনি আপনার প্রয়োজনগুলো আল্লাহর কাছে সরাসরি বলবেন। এবং আমি নিজেকে এবং আপনাকে স্বরন করিয়ে দিচ্ছি, আমাদের যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যেটা আমাদের অন্যসব চাহিদাগুলোকে এমনিতেই পূরন করে দিবে, সেটা হলো ইস্তিগফার। এখন ইস্তিগফার হতে পারে তোতা পাখিরমতো জপ করা, অথবা হতে পারে মনের গভীরের উপলব্ধি।

মানুষ মুলত নিন্দা সহ্য করতে পারে না। আমি যদি আপনার কোন ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে বলি, শুনলাম আপনি এটা বলেছেন। আপনি কেন এমন বললেন? তখন আপনি বলবেন, ” আমি এভাবে বলিনি। তুমি বুঝবে না আমার সমস্যা। না বুঝে কথা বলো না। তুমি পুরো ব্যাপারটাই জানো না। অথবা বললাম, আমি দেখলাম তুমি এটা এটা করেছ। সাথে সাথে আপনি রেগে যাবেন।

৭৫:১৪-১৫ (বালিল ইনছা-নু আলা – নাফছিহি বাসীরাহ। ওয়া লাও আকলা- মা আ-যীরাহ)

” বরং মানুষ নিজেই তার নিজের সম্পর্কে চক্ষুমান। যদিও সে তার অজুহাত পেশ করতে চাইবে।”

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হলে আপনাকে একটা সময় বের করতে হবে। আপনি আরবি না জানলেও ক্ষতি নেই। আপনি যদি শুধু বাংলা জানেন, শুধু ইংরেজি বা শুধু উর্দু জানেন সমস্যা নেই। আল্লাহর সাথে নিজের ভাষায় কথা বলুন এবং মন থেকে আপনার গুনাহগুলো স্বীকার করুন। আর কোন অজুহাত দিবেন না। এটা করা খুব কঠিন। কারণ মানুষ যখন নিজেকে আয়নাতে দেখে তখন নিজেকেও মিথ্যা বলে। নিজেকে বলে আমি অতটাও খারাপ না। আমি যা করেছি তার পেছনে কারন আছে। আমি অনেক কষ্টে ছিলাম।

কিন্তু যখন আপনি আল্লাহর সামনে দাড়াবেন তখন অজুহাত দেবার কথা ভুলে যান। কারন আপনার সব অজুহাত তিনি আগে থেকেই জানেন। তিনি জানেন আপনি কী কষ্ট সহ্য করেছেন। তিনি আপনার সমস্যাগুলোর কথা জানেন। ” ইয়া রব আমি অনেক মানসিক চাপে ছিলাম তাই মদ খেয়েছি। এই ধরনের মা কৈফিয়ত তাকে দিবেন না। কারন তিনি এসবের ব্যাপারে আপনার থেকেও ভালো জানেন।

তার সামনে আপনাকে আসতে হবে সম্পুর্ন আত্নসমর্পন করে। কোন ঢাল বর্ম ছাড়া। সব দ্বীধা, লজ্জা ও অস্বত্তি ফেলে। আপনি অন্য কারো কাছে স্বীকার করতেও লজ্জাপাবেন যতক্ষন না আপনি একেবারে খোলাখুলিভাবে আল্লাহর কাছে সব স্বীকার করবেন। আপনি যেসব খারাপ কাজ করেছেন, যেসব ভূল করেছেন। আর আমি আপনাকে বলছি যখন আপনি আপনার অন্তরের ময়লাগুলোকে শব্দে পরিনত করবেন তখন আপনার গালবেয়ে কান্না ঝরতে বাধ্য। মানুষ যখন কারো সামনে মনের সব ঢাল বর্ম খুলে ফেলে বিশেষ করে আল্লাহর সামনে তখন তার চোখ দিয়ে পানি ঝরবেই ঝরবে। কারন সেটা খুব দুর্বল একটি মুহুর্ত।

দুনিয়াকে আপনি দেখাতে আপনি কতটা শক্তিশালী আর আত্নবিশ্বাসী। আপনি কতটা ভালো আছেন। যেই আপনাকে দেখে আর ভাবে সব ঠিক আছে। কিন্তু একমাত্র যিনি জানেন যে সব ঠিক নেই অনেক সমস্যা আছে তিনি হচ্ছেন আল্লাহ।আপনাকে তার কাছে সব খুলে বলতে হবে। তখনই আপনি সত্যিকারের ক্ষমা চাওয়ার পর্যায়ে যাবেন। তখনই আপনি সিজদায় ভিক্ষা চাইবেন। আর তখন আইসতাগফিরুল্লাহ, আইসতাগফিরুল্লাহ, শুধুই কতগুলো শব্দ হবে না। তখন সেটা হবে আল্লাহর সাথে সত্যিকারের একটা কথোপকথন। আল্লাহর কাছে সত্যিকারের স্বীকারোক্তি এটা যে, কতটা কার্যকরি সেটা নিজে করে দেখুন।

আপনার একান্ত নিজের জন্য একটা সময় বের করতে হবে। আর কেউ যেন কিছু শুনতে না পায়। হয়তো মধ্যরাতও আপনার জন্য সঠিক সময় না যদি এমন হয় আপনার স্ত্রী আপনার পাশে শুয়ে সব শুনতে পাচ্ছে। হয়তো আপনি যখন একাকি গাড়িতে বসে আছেন সেটাই সময়। একা হওয়াটাই জরুরি। এটা আপনার আল্লাহর সাথে একান্ত সময়। এবং কথাগুলো উচ্চারণ করুন। নিজেকে বলতে শুনুন। ফিসফিস করে বলবেন না।

আর যদি আপনি কয়েকটা দোয়া আরবিতে মুখস্থ করে তোতাপাখির মতো আওড়াতে থাকেন যেগুলোর অর্থও আপনার অজানা সেই দোয়াগুলো অনেক সুন্দর ও জোড়ালো। আপনি সেগুলো আওড়াচ্ছেন অথচ আপনার মন সেগুলো বলছে না। শুধু আপনার জিভ বলছে। তাহলে আপনি ইস্তেগফার চাওয়া শুরুই করেননি। আপনি যে আরবি দোয়াগুলো পড়ছেন তার জন্য আল্লাহ আপনাকে প্রতিদান দিক। কিন্তু এটাকে ইস্তিগফার বলে না। ইস্তিগফার অন্য জিনিস। এবং যখন অশ্রু ঝরে ও মনের দ্বীধা খুলে যায় তখন প্রাচুর্যের দরজা খুলে যায়।

 

Md Amir

সত্যকে খুঁজে বেড়াই। সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকি। আর তা অন্যদেরকে অনুপ্রেরণা দেবার চেষ্টা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!