স্রষ্টার সন্ধানে

কোন শিশুকে জঙ্গলে একা ফেলে রাখলে সেও স্রষ্টার সন্ধান করবে, তার সাহায্য চাইবে। শিশুটিও মনে করে সৃষ্টিকর্তা একজন আছেন। অন্তরে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করবে।

একটি ছোট বাচ্চাকে লুকিয়ে থেকে যদি ‘ডিল’ মারেন তখন দেখবেন সেই বাচ্চা শিশুটিও চারিদিকে তাকাতে থাকবে। সেও জানে ডিলটি এমনি এমনি এসে তার গায়ে লাগতে পারে না। কেউ না কেউ ডিলটি মেরেছে। যেহতু কারো পরিকল্পনায় ডিলটি মারা হয়েছে; তাইতো সে চারিদিকে তাকাতে থাকবে, কে তাকে ডিলটি মারলো ? ডিলটি যেমন এমনি এমনি এসে তার গায়ে লাগতে পারে না; তেমনি এই পৃথিবীও এমনি এমনি সৃস্টি হয়নি। কারো পরিকল্পনায় সৃস্টি হয়েছে এই সৌরজগত।
আর এই সৌরজগতের মধ্যে যদি সুশৃংখল ডিজাইন দেখতে পাওয়া যায় -তাহলে তো আর বলার অপেক্ষা থাকে না যে একজন বুদ্ধিমান সত্তা এই সৌরজগত সৃস্টি করেছেন। আর তিনিই আমাদের স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা।
মনে করুন, লক্ষ লক্ষ লোগো (Logo) দিয়ে আপনি একটি বড় শহর তৈরী করেছেন। শহরটিতে আকাশছোঁয়া অনেক বিল্ডিং আছে; আছে আঁকাবাঁকা অসংখ্য রাস্তা, রেলওয়ে স্টেশন, বিমানবন্দর, ছোটোবড় শপিং মল, পাতাল রেল, নদ-নদী, লেক, বনভূমি, ও একটি চমৎকার সমুদ্র সৈকত। ধরুন, লক্ষ লক্ষ লোক এ-শহরের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে; আবার অনেকে নিজ নিজ ঘরে বসে আরাম করছে বা অফিসে-আদালতে কাজ করছে। ছোটোখাটো বিষয়গুলোর কথাও মনে করুন। ট্রাফিক লাইট, রাস্তার ওপরে বা মোড়ে মোড়ে স্থাপিত বিভিন্ন আকারের ও রং-এর বিলবোর্ডগুলোর কথাও ভুলে যাবেন না।
এখন ধরুন, একজন আপনার কাছে এলো এবং এসে বললো যে, গোটা শহরটি একটি দুর্ঘটনার ফল। আপনি গোটা শহরটি তৈরী করেছেন আগাগোড়া একটি পরিকল্পনা অনুসারে; ছোটোখাটো বিষয়গুলিও আপনার মনোযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়নি। আপনি এক-একটি লোগো অতি যত্নের সঙ্গে উঠিয়েছেন এবং জায়গামতো বসিয়েছেন এবং বসিয়েছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। এরই পরিণতিতে গড়ে উঠেছে এই শহর। আর আলোচ্য ভদ্রলোক বলছেন যে, গোটা শহরটিই গড়ে উঠেছে স্রেফ একটি দুর্ঘটনার ফলে! এখন বলুন, লোকটি সম্পর্কে আপনার মনে কী ধারণা হবে?
এখন চলুন আমরা আপনার বানানো শহরে আবার ফিরে যাই। ধরা যাক, আপনি এমনভাবে শহরটি তৈরী করেছেন যে, মাত্র একটি লোগো স্থানচ্যুত হলে বা নিজের স্থান ছাড়া অন্য স্থানে বসানো হলে, গোটা শহরটাই মাটির সঙ্গে মিশে যাবে বা অন্যভাবে বললে, ধ্বংস হয়ে যাবে। ভাবুন তো, কী অসাধারণ ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আপনাকে শহর তৈরীর সময়!
এবার আপনার বানানো কাল্পনিক শহর থেকে চলুন বাস্তবের বিশ্বে। এ-বিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে তেমনি অসংখ্য সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অথচ অতি-প্রয়োজনীয় বিষয়ের সমন্বয়ে। গোটা চিত্রটা মানুষের কল্পনারও বাইরে! ক্ষুদ্রতম একটি উপাদানের অনুপস্থিতিতেও সম্ভর ছিল না এ-বিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি বা টিকে থাকা!
এ-মহাবিশ্বে সবকিছু কাজ করছে এক অনন্য সাধারণ ও পারফেক্ট প্রক্রিয়ায়। বস্তুর ক্ষুদ্রতম অংশ পরমাণু থেকে শুরু করে, কোটি কোটি কোটি তারকাসমৃদ্ধ গ্যালাক্সিসমূহ; পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য সাথী চাঁদ থেকে শুরু করে, আমাদের গোটা সৌরজগত—সবকিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করে চলেছে সুশৃংখলভাবে। সবকিছুই চলছে একটি সিস্টেমের অধীন এবং এ-সিস্টেমটিকে তুলনা করা চলে একটি ঘড়ির সঙ্গে। এ-সিস্টেমটি কোটি কোটি বছর ধরে এতো নিখুঁতভাবে কাজ করছে যে, মানুষ এর ওপর ভরসা করে দিব্যি নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যাচ্ছে। শুধু কি তাই? মানুষ আগামী দশ বছরের বা পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা করতেও দ্বিধা করছে না। কারণ, কোটি কোটি বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ-সিস্টেমটি আগামীতেও অমন নিখুঁতভাবেই এবং কোনো রকম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ব্যতিরেকেই অটুট থাকবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করে। আগামীকাল সূর্য উঠবে কি উঠবে না—এ নিয়ে কারো মনেই বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই; নেই কোনো উদ্বেগ। “সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে, আমাদের এই পৃথিবীটার মহাশূন্যের অচেনা-অজানা অন্ধকারে চলে যাবার সম্ভাবনা আছে কি?”—এ ধরনের প্রশ্ন বলতে গেলে কোনো মানুষের মনেই জাগে না; না কেউ প্রশ্ন করে: “কে তা ঘটতে দিচ্ছে না?”।
মানুষ যখন ঘুমায়, তার ব্রেন বিশ্রাম নেয়। কিন্তু মানুষের ঘুমের সময়ও তার হার্ট চলতে থাকে অবিরাম; অবিরাম চলতে থাকে শ্বাসযন্ত্রও। ঘুমের সময় তার হার্ট চলবে, চলবে শ্বাসযন্ত্রও—এ নিয়ে কি কখনো সে সন্দিহান হয়ে ওঠে? না, ওঠে না। সে কতো নিশ্চিতই না থাকে এ-ব্যাপারে! অথচ হার্টের ক্রিয়া বা শ্বাসযন্ত্রের কাজ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেলেও হতে পারে তার মৃত্যু!!
আমরা জানি যে, এ সবই প্রাকৃতিক নিয়মে চলছে। কিন্তু এ-নিয়মই বা কে সৃষ্টি করেছেন? কে এমন একটি সূক্ষ্ম, জটিল, ও বিশাল সিস্টেম চালু করে দিয়েছেন—যা এক চুল পরিমাণ এদিক-ওদিক হলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? বস্তুত, একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের জীবন যেন লটকে আছে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম সুতার ওপর। এ কার পরিকল্পনার ফল? এ সৃষ্টিজগতের যেখানেই আপনি দৃষ্টি ফেলবেন, দেখবেন কী চমৎকার ও পারফেক্ট শৃংখলা এবং ভারসাম্য বজায় আছে সর্বত্র; কোথাও কোনো খুঁত নেই। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এ অসাধারণ শৃংখলা ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার স্রষ্টা একজন মহা-ক্ষমতাবান সত্ত্বা। এই মহা-ক্ষমতাবান সত্ত্বাই হচ্ছেন আল্লাহ—যিনি সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন শূন্য থেকে। কুরআন এ-সম্পর্কে কী বলছেন শুনুন:
সুরা আল মুলক: আয়াত ৩ ও ৪ ।
الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِن تَفَاوُتٍ فَارْجِعِ الْبَصَرَ هَلْ تَرَى مِن فُطُورٍ
তিনি সপ্ত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। তুমি করুণাময় আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টিতে কোন তফাত দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টিফেরাও; কোন ফাটল দেখতে পাও কি?
He Who created the seven heavens one above another: No want of proportion wilt thou see in the Creation of ((Allah)) Most Gracious. So turn thy vision again: seest thou any flaw?
ثُمَّ ارْجِعِ الْبَصَرَ كَرَّتَيْنِ يَنقَلِبْ إِلَيْكَ الْبَصَرُ خَاسِأً وَهُوَ حَسِيرٌ
অতঃপর তুমি বার বার তাকিয়ে দেখ-তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও পরিশ্রান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে।
Again turn thy vision a second time: (thy) vision will come back to thee dull and discomfited, in a state worn out.
যখন আমরা আসমান, পৃথিবী এবং আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে যা-কিছু আছে—সেসবের দিকে তাকাই, তখন উপলদ্ধি করি যে, এ সবকিছুই একজন স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে।

২১০টি ইসলামি বই ডাউনলোড করুন

পাপকাজ কি তাকদীর অনুযায়ী হয় ?

86 total views, 1 views today

Leave a Reply

1 Comment on "স্রষ্টার সন্ধানে"

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
wpDiscuz