সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব (পর্বঃ০১)

কোন শিশুকেও যদি লুকিয়ে থেকে ডিল মারেন তখন দেখবেন শিশুটি চারিদিকে তাকাতে থাকবে কে তাকে ডিল মারল ? শিশুটিও জানে ডিলটি এমনি এমনি এসে তার গায়ে লাগতে পারে না। নিশ্চয় কারো পরিকল্পনায় তাকে ডিলটি মারা হয়েছে। আর পরিকল্পনাকারী যেহুতু আছে সুতরাং তার অস্তিত্বও আছে। তাইতো শিশুটি চারিদিকে তাকাতে থাকবে কে সেই পরিকল্পনাকারী।           তেমনি গ্রহ, নক্ষত্র, চ্দ্র,সূর্য, পাহাড়, পর্বত, নদী, সাগর….ও এমনি এমনি হতে পারে না। নিশ্চয় কারো পরিকল্পনায় এই সৌরজগত সৃস্টি হয়েছে। আর পরিকল্পনাকারী যেহুতু আছে সুতরাং তার অস্তিত্ব ও আছে। মুলত সৃস্টি জগত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করলেই একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমান হয়ে যায়। রোবট তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বালুর মধ্যে এলোমেলোভাবে ফেলে দিলেই তা একটি রোবটে পরিণত হয় না। একটি টর্নেডো ঝড়ে এরোপ্লেন তৈরি হয় না। রোবট, এরোপ্লেন তৈরি করতে বছরের পর বছর মানুষকে গবেষনা করতে হয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে মানুষের মত বুদ্ধিমান প্রানি কারো পরিকল্পনা ছাড়া এমনি এমনি সৃস্টি হয়েছে ?  হৃদপিন্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমনি এমনি কাজ করে যাচ্ছে কারো হস্তক্ষেপ ছাড়াই ?     চোখের ডিজাইন, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্ত সংবহনতন্ত্র, নারি-পুরুষের গঠনগত পার্থক্য এসব বিষয় নিয়ে সামান্য চিন্তা করলেই আমরা একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব খুজে পাই।
মনে করুন, লক্ষ লক্ষ লোগো (Logo) দিয়ে আপনি একটি বড় শহর তৈরী করেছেন। শহরটিতে আকাশছোঁয়া অনেক বিল্ডিং আছে; আছে আঁকাবাঁকা অসংখ্য রাস্তা, রেলওয়ে স্টেশন, বিমানবন্দর, ছোটোবড় শপিং মল, পাতাল রেল, নদ-নদী, লেক, বনভূমি, ও একটি চমৎকার সমুদ্র সৈকত। ধরুন, লক্ষ লক্ষ লোক এ-শহরের রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে; আবার অনেকে নিজ নিজ ঘরে বসে আরাম করছে বা অফিসে-আদালতে কাজ করছে। ছোটোখাটো বিষয়গুলোর কথাও মনে করুন। ট্রাফিক লাইট, রাস্তার ওপরে বা মোড়ে মোড়ে স্থাপিত বিভিন্ন আকারের ও রং-এর বিলবোর্ডগুলোর কথাও ভুলে যাবেন না। এখন ধরুন, একজন আপনার কাছে এলো এবং এসে বললো যে, গোটা শহরটি একটি দুর্ঘটনার ফল। আপনি গোটা শহরটি তৈরী করেছেন আগাগোড়া একটি পরিকল্পনা অনুসারে; ছোটোখাটো বিষয়গুলিও আপনার মনোযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়নি। আপনি এক-একটি লেগো অতি যত্নের সঙ্গে উঠিয়েছেন এবং জায়গামতো বসিয়েছেন এবং বসিয়েছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। এরই পরিণতিতে গড়ে উঠেছে এই শহর। আর আলোচ্য ভদ্রলোক বলছেন যে, গোটা শহরটিই গড়ে উঠেছে স্রেফ একটি দুর্ঘটনার ফলে! এখন বলুন, লোকটি সম্পর্কে আপনার মনে কী ধারণা হবে? এখন চলুন আমরা আপনার বানানো শহরে আবার ফিরে যাই। ধরা যাক, আপনি এমনভাবে শহরটি তৈরী করেছেন যে, মাত্র একটি লেগো স্থানচ্যুত হলে বা নিজের স্থান ছাড়া অন্য স্থানে বসানো হলে, গোটা শহরটাই মাটির সঙ্গে মিশে যাবে বা অন্যভাবে বললে, ধ্বংস হয়ে যাবে। ভাবুন তো, কী অসাধারণ ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আপনাকে শহর তৈরীর সময়! এবার আপনার বানানো কাল্পনিক শহর থেকে চলুন বাস্তবের বিশ্বে। এ-বিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি সম্ভব হয়েছে তেমনি অসংখ্য সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অথচ অতি-প্রয়োজনীয় বিষয়ের সমন্বয়ে। গোটা চিত্রটা মানুষের কল্পনারও বাইরে! ক্ষুদ্রতম একটি উপাদানের অনুপস্থিতিতেও সম্ভর ছিল না এ-বিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি বা টিকে থাকা! এ-মহাবিশ্বে সবকিছু কাজ করছে এক অনন্যসাধারণ ও পারফেক্ট প্রক্রিয়ায়। বস্তুর ক্ষুদ্রতম অংশ পরমাণু থেকে শুরু করে, কোটি কোটি কোটি তারকাসমৃদ্ধ গ্যালাক্সিসমূহ; পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য সাথী চাঁদ থেকে শুরু করে, আমাদের গোটা সৌরজগত—সবকিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করে চলেছে সুশৃংখলভাবে। সবকিছুই চলছে একটি সিস্টেমের অধীন এবং এ-সিস্টেমটিকে তুলনা করা চলে একটি ঘড়ির সঙ্গে। এ-সিস্টেমটি কোটি কোটি বছর ধরে এতো নিখুঁতভাবে কাজ করছে যে, মানুষ এর ওপর ভরসা করে দিব্যি নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্ম করে যাচ্ছে। শুধু কি তাই? মানুষ আগামী দশ বছরের বা পঞ্চাশ বছরের পরিকল্পনা করতেও দ্বিধা করছে না। কারণ, কোটি কোটি বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এ-সিস্টেমটি আগামীতেও অমন নিখুঁতভাবেই এবং কোনো রকম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ব্যতিরেকেই অটুট থাকবে বলে তাঁরা বিশ্বাস করে। আগামীকাল সূর্য উঠবে কি উঠবে না—এ নিয়ে কারো মনেই বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই; নেই কোনো উদ্বেগ। “সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ থেকে মুক্ত হয়ে, আমাদের এই পৃথিবীটার মহাশূন্যের অচেনা-অজানা অন্ধকারে চলে যাবার সম্ভাবনা আছে কি?”—এ ধরনের প্রশ্ন বলতে গেলে কোনো মানুষের মনেই জাগে না; না কেউ প্রশ্ন করে: “কে তা ঘটতে দিচ্ছে না?”। মানুষ যখন ঘুমায়, তার ব্রেন বিশ্রাম নেয়। কিন্তু মানুষের ঘুমের সময়ও তার হার্ট চলতে থাকে অবিরাম; অবিরাম চলতে থাকে শ্বাসযন্ত্রও। ঘুমের সময় তার হার্ট চলবে, চলবে শ্বাসযন্ত্রও—এ নিয়ে কি কখনো সে সন্দিহান হয়ে ওঠে? না, ওঠে না। সে কতো নিশ্চিতই না থাকে এ-ব্যাপারে! অথচ হার্টের ক্রিয়া বা শ্বাসযন্ত্রের কাজ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ হয়ে গেলেও হতে পারে তার মৃত্যু!! আমরা জানি যে, এ সবই প্রাকৃতিক নিয়মে চলছে। কিন্তু এ-নিয়মই বা কে সৃষ্টি করেছেন? কে এমন একটি সূক্ষ্ম, জটিল, ও বিশাল সিস্টেম চালু করে দিয়েছেন—যা এক চুল পরিমাণ এদিক-ওদিক হলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? বস্তুত, একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারি যে,
একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। আমাদের জীবন যেন লটকে আছে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম সুতার ওপর। এ কার পরিকল্পনার ফল? এ সৃষ্টিজগতের যেখানেই আপনি দৃষ্টি ফেলবেন, দেখবেন কী চমৎকার ও পারফেক্ট শৃংখলা এবং ভারসাম্য বজায় আছে সর্বত্র; কোথাও কোনো খুঁত নেই। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, এ অসাধারণ শৃংখলা ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার সৃস্টিকর্তা একজন মহা-ক্ষমতাবান সত্ত্বা। এই মহা-ক্ষমতাবান সত্ত্বাই হচ্ছেন আল্লাহ—যিনি সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন শূন্য থেকে। কুরআন এ-সম্পর্কে কী বলছেন শুনুন: “যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন স্তরে স্তরে সপ্তাকাশ। দয়াময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখিতে পাইবে না; তুমি আবার তাকাইয়া দেখ, কোনো ক্রটি দেখিতে পাও কি? অতঃপর তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরাও; সেই দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হইয়া তোমার দিকে ফিরিয়া আসিবে।”–(সুরা মুল্ক; আয়াত-২ ও ৩)। যখন আমরা আসমান, পৃথিবী এবং আসমান ও পৃথিবীর মাঝখানে যা-কিছু আছে—সেসবের দিকে তাকাই, তখন উপলদ্ধি করি যে, এ সবকিছুই একজন  সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে।

Md Amir

সত্যকে খুঁজে বেড়াই। সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকি। আর তা অন্যদেরকে অনুপ্রেরণা দেবার চেষ্টা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *