রোজার বিধিবিধান [পর্ব-০৫] :: সাওম বা রোজার আধুনিক মাসয়ালা

যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পর ইফতার করল, অতঃপর বিমান উড্ডয়নের পর সূর্য দেখতে পেল তার কি করনীয় ? 

বিবরণ: কোনো মুসাফির ব্যক্তির এমন হতে পারে যে, তার সাওম পালন অবস্থায় বিমান উড্ডয়নের পূর্বে সূর্য অস্ত গেল। ফলে সে ইফতার করল, কিন্তু বিমান উড্ডয়নের পরে সে সূর্য দেখতে পেল। এমতাবস্থায় সে কি খানা-পিনা পরিহার করে চলবে নাকি খানা-পিনা চালিয়ে যাবে?
পর্যালোচনা: সূর্য ডুবার পর যে ব্যক্তি ইফতার করল, অতঃপর বিমান উড্ডয়নের পর সূর্য দেখতে পেল, সে খানা-পিনা চালিয়ে যেতে পারবে এবং তার সাওম বিশুদ্ধ বলে পরিগণিত হবে।
সঊদী আরবের ফাতওয়া বোর্ডের স্থায়ী কমিটি এবং শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ. এই মত গ্রহণ করেছেন। শাইখ উসাইমীন রহ. তার মতামত প্রকাশের পর নিম্নোক্ত হাদীসটি দলীল হিসাবে পেশ করেন,
«إِذَا أَقْبَلَ اللَّيْلُ مِنْ هَاهُنَا، وَأَدْبَرَ النَّهَارُ مِنْ هَاهُنَا، وَغَرَبَتِ الشَّمْسُ، فَقَدْ أَفْطَرَ الصَّائِمُ»
“পূর্ব দিক থেকে যখন রাত এসে যাবে এবং পশ্চিম দিক থেকে যখন দিন চলে যাবে ও সূর্য ডুবে যাবে, তখন সাওম পালনকারী ইফতার করবে”।       [ সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৯৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১০০।  ]

তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি যেহেতু শর‘ঈ দলীলের আলোকে ইফতার করেছে, সেহেতু অন্য কোনো শর‘ঈ দলীলের আলোকে ছাড়া খানা-পিনা ত্যাগ করা তার জন্য জরুরি হবে না।

যেসব দেশে রাত বা দিন ২৪ ঘন্টারও বেশি সময়ে প্রলম্বিত, সেসব দেশে কীভাবে সাওম পালন করতে হবে?

বিবরণ: কিছু কিছু দেশে দিন বা রাত ২৪ ঘন্টারও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকে। এমনকি কোনো কোনো দেশে ৬ মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কীভাবে সাওম পালন করবে? অনুরূপভাবে কোনো কোনো দেশে ২৪ ঘন্টায় রাত-দিন হয়, কিন্তু রাত-দিনের কোনো একটি ২০ ঘন্টা বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত লম্বা হয়। তাদের সাওম পালনের নিয়মইবা কী হবে?
পর্যালোচনা: এসব দেশে যে সময় হিসাব করে সালাতের সময় নির্ধারণ করতে হবে, সে বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। নাউওয়াস ইবন সাম‘আন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,
«قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا لَبْثُهُ فِي الْأَرْضِ؟ قَالَ: «أَرْبَعُونَ يَوْمًا، يَوْمٌ كَسَنَةٍ، وَيَوْمٌ كَشَهْرٍ، وَيَوْمٌ كَجُمُعَةٍ، وَسَائِرُ أَيَّامِهِ كَأَيَّامِكُمْ» قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللهِ فَذَلِكَ الْيَوْمُ الَّذِي كَسَنَةٍ، أَتَكْفِينَا فِيهِ صَلَاةُ يَوْمٍ؟ قَالَ: «لَا، اقْدُرُوا لَهُ قَدْرَهُ»
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! পৃথিবীতে সে কতদিন অবস্থান করবে? তিনি বললেন, ৪০ দিন। প্রথম দিন এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান। আর বাকী দিনগুলো তোমাদের দিনগুলোর মতোই। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যে দিনটি এক বছরের সমান হবে, সে দিনে আমাদের একদিনের সালাত কি যথেষ্ট হবে? তিনি বললেন, না। তোমরা ঐদিনের হিসাব করবে।”                                 [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৩৭]
বেশিরভাগ ওলামায়ে কেরামের মতে, ঐসব দেশের সবচেয়ে কাছাকাছি যেসব দেশে রাত-দিনের স্বাভাবিক আবর্তন ঘটে এবং শরী‘আত নির্ধারিত আলামত অনুযায়ী সালাত ও সাওমের সময় জানা যায়, সেসব দেশের হিসাব অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে হবে। ‘রাবেত্বাতুল আলাম আল-ইসলামী’-এর প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ এই মতের পক্ষাবলম্বন করেছে। সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদও এজাতীয় মত প্রকাশ করেছে। দিন অত্যধিক লম্বা হোক বা অত্যধিক খাঁটো হোক ফজর উদয় হওয়া থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সাওম পালন করা এসব দেশের বাসিন্দাদের ওপর ওয়াজিব। তবে দিন যদি অত্যধিক লম্বা হয় এবং কেউ অসুস্থতার কারণে সাওম পালনে অক্ষম হয়, বা তার অসুখ বেড়ে যায়, বা আরোগ্য লাভের গতি মন্থর হয়ে যায়, অথবা বার্ধক্যজনিত কারণে বা অন্য কোনো কারণে সাওম পালনে অক্ষম হয়, তাহলে সে সাওম ছেড়ে দিবে এবং পরবর্তীতে কাযা আদায় করবে।
‘রাবেত্বাতুল আলাম আল-ইসলামী’-এর প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ এবং সঊদী আরবের উচ্চ উলামা পরিষদ এই মতের পক্ষাবলম্বন করেছে। তারা বলেন, শরী‘আতের বিধান সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন,
﴿وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ثُمَّ أَتِمُّواْ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيۡلِۚ﴾ [البقرة: ١٨٧]
“আর পানাহার কর যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রাত পর্যন্ত সাওম পূর্ণ কর”। [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭] শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রহ. বলেন, ‘যদি সেখানে রাত ও দিন হয়ে থাকে, তাহলে লম্বা হোক বা খাঁটো হোক রাত ও দিন ধর্তব্য হবে। এমনকি যদি ধরে নেওয়া হয়, রাত ৪ ঘন্টা এবং দিন ২০ ঘন্টা, তবুও রাতকে রাত এবং দিনকে দিন ধরতে হবে। তবে যদি সেখানে রাত ও দিনের ব্যাপার না থাকে, তাহলে সময় হিসাব করতে হবে। যেমন, সুমেরু ও কুমেরুর অঞ্চলসমূহ।

 

সাওম পালনকারীর অক্সিজেন নেওয়ার বিধানঃ

বিবরণ: শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যার কারণে সহজভাবে নিঃশ্বাস নেওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু কিছু রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। অক্সিজেন এক ধরণের বায়ূ, যাতে খাদ্য জাতীয় কোনো পদার্থ থাকে না। এর বেশিরভাগই যায় শ্বাসনালীতে। এক্ষণে, রামাযানের দিবসে সাওম পালনকারীর জন্য এই অক্সিজেন ব্যবহারের হুকুম কী?
হুকুম: অক্সিজেন সাওম ভঙ্গকারী বিষয় হিসাবে গণ্য হবে না। অক্সিজেন নিঃশ্বাসের সাথে স্বাভাবিক বায়ূ গ্রহণের মতোই।

সাওম পালনকারীর জন্য নাকের ড্রপ ব্যবহারের বিধানঃ 

কোনো কোনো সময় মানুষ এমন অসুখে আক্রান্ত হয় যে, তার জন্য নাকের ড্রপ ব্যবহার করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। যেমন, কেউ দীর্ঘস্থায়ী সর্দিতে আক্রান্ত হলে বা নাকে এলার্জির সমস্যা থাকলে ড্রপ ব্যবহার করতে হয়। এক্ষণে, রামাযানের দিবসে সাওম পালনকারীর জন্য নাকের এই ড্রপ ব্যবহারের হুকুম কী?

নাকের ড্রপ সাওম ভঙ্গ করবে। বর্তমান যুগের ওলামায়ে কেরামের মধ্যে যাঁরা এই মত ব্যক্ত করেছেন, শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায এবং শাইখ মুহাম্মাদ ইবন উসাইমীন রহ. তাদের অন্যতম। লাক্বীত ইবন সবিরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«بَالِغْ فِي الِاسْتِنْشَاقِ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ صَائِمًا»
“নাকের ভেতর অতি উত্তমরূপে পানি দিবে, তবে যখন তুমি সাওম অবস্থায় থাকবে, তখন নয়”।[ সুনান আবু দাঊদ, হাদীস নং ১৪২ ]
উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, পাকস্থলীতে পৌঁছতে পারে এমন কোনো ড্রপ নাকে ব্যবহার করা সাওম পালনকারীর জন্য জায়েয নেই। আর হাদীস, বাস্তবতা ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাধ্যমে একথা সবারই জানা যে, নাক কণ্ঠনালীর প্রবেশ পথ।
উক্ত হাদীস প্রমাণ করে, নাক প্রথমে কণ্ঠনালী, অতঃপর পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম রাস্তা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটি প্রমাণ করেছে। বিশেষ করে ‘অঙ্গব্যবচ্ছেদ বিদ্যা’ (এ্যানাটমি/Anatomy) সন্দেহের এতটুকু সুযোগ রাখে নি যে, নাকের সাথে কণ্ঠনালীর গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

সাওম পালনকারীর জন্য কানের ড্রপ ব্যবহারের বিধানঃ

বিবরণ: কেউ কেউ কানে নানা সমস্যা অনুভব করে। ফলে তাদেরকে কখনও কখনও এমন ঔষধ দেওয়া হয়, যা কানে প্রয়োগ করা হয়। এক্ষণে, রামাযানের দিবসে সাওম পালনকারীর জন্য কানের এ জাতীয় ঔষধ ব্যবহারের হুকুম কি?
হুকুম: ওলামায়ে কেরাম এই মাসআলায় ২ ধরণের বক্তব্য পেশ করেছেন:
প্রথম মত: হানাফী, মালেকী এবং শাফে‘ঈদের বিশুদ্ধতর মতানুযায়ী, কানে তেল দিলে বা পানি দিলে সাওম ভেঙ্গে যাবে, তবে হাম্বলীদের মতানুযায়ী, তা যদি মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে, তাহলে সাওম ভঙ্গ হবে।
তাদের মতে, কানে যা প্রয়োগ করা হয়, তা যেহেতু কণ্ঠনালী বা মস্তিষ্কে যায়, সেহেতু তা সাওম ভঙ্গ করবে।
দ্বিতীয় মত: ইবন হাযমের মত ও শাফে‘ঈদের ভিন্ন আরেকটি মতানুযায়ী, কানে প্রয়োগকৃত ঔষধ সাওম ভঙ্গ করবে না। তাদের যুক্তি হচ্ছে, কানে প্রয়োগকৃত ঔষধ মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে না, তবে তা শিরা-উপশিরা ও লোমকূপের মাধ্যমে পৌঁছে।
মূলতঃ উভয় মতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কেননা কানে প্রয়োগকৃত ঔষধ পেটে প্রবেশ করে কিনা সেটিই এখানে মূল বিষয়। আর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে যে, কান এবং পেট ও মস্তিষ্কের মধ্যে এমন কোনো নালা নেই, যেখান দিয়ে তরল পদার্থ প্রবেশ করতে পারে। তবে কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই তথ্যানুযায়ী প্রত্যেকের মতামতের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, কানের ড্রপ সাওম ভঙ্গ করে না।
তবে যদি কানের পর্দা না থাকে, তাহলে ‘ইউস্টেশন টিউব’ (Eustachian tube) নামক নালার মাধ্যমে গলবিলের সাথে কানের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় এবং এক্ষেত্রে কান নাকের মতো হয়ে যায়। অতএব, নাকের ড্রপ ব্যবহারের যে বক্তব্য গত হয়ে গেছে, এখানেও সেই একই বক্তব্য প্রযোজ্য হবে।

সাওম পালনকারীর জন্য চোখের ড্রপ ব্যবহারের বিধানঃ

বিবরণ: কেউ কেউ চোখের নানা রোগে ভোগে। ফলে তাদেরকে কখনও কখনও এমন ঔষধ দেওয়া হয়, যা চোখে প্রয়োগ করা হয়। এক্ষণে, রমযানের দিবসে সাওম পালনকারীর জন্য চোখের এ জাতীয় ঔষধ ব্যবহারের হুকুম কী?
হুকুম: সুরমা বা এ জাতীয় অন্য কিছু চোখে দিলে সাওম ভাঙ্গবে কিনা সে বিষয়ে ফকীহগণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তাদের ভিন্ন মত প্রকাশের কারণ হচ্ছে এই যে, চোখ কি মুখের মতো পেটে কোনো কিছু প্রবেশের পথ হিসেবে গণ্য হবে নাকি চোখ ও পেটের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই? নাকি চোখে প্রয়োগকৃত ঔষধ পেটে প্রবেশ করে শিরা-উপশিরার মাধ্যমে?
* হানাফী ও শাফে‘ঈদের নিকট চোখ ও পেট বা চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে কোনো প্রবেশ পথ নেই। ফলে তাদের মতে, চোখে ঔষধ দিলে সাওম ভাঙ্গবে না।
* পক্ষান্তরে মালেকী ও হাম্বলীদের নিকট, মুখ ও নাকের মত চোখও কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পথ। অতএব, সাওম পালনকারী যদি চোখে সুরমা ব্যবহার করে এবং গলনালীতে তার স্বাদ পায়, তাহলে তার সাওম ভেঙ্গে যাবে।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. সুরমা ব্যবহারের ব্যাপারে ফকীহগণের মতভেদ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন এবং তাঁর কাছে সুরমা সাওম ভঙ্গ করবে না বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাওম পালনকারীর জন্য সুরমা ব্যবহারের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তবে ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ বিষয়ে কোনো সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না”।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, চোখ, কান, অতঃপর গলনালী পর্যন্ত পৌঁছে দিতে একটি বিশেষ নালা রয়েছে।
চোখের ড্রপের ব্যাপারে আগের যুগের ওলামায়ে কেরামের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে কানের ড্রপ ও চোখের সুরমার ব্যাপারে তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, তাদের নিকট মূলনীতি হচ্ছে, চোখ পেটে কোনো কিছু পৌঁছার প্রবেশ পথ কিনা। সুতরাং আমরা যদি আগেকার ফকীহগণের নিকট চোখের ড্রপ ব্যবহারের হুকুম জানতে চাই, তাহলে সুরমার ব্যাপারে তাদের মতভেদ জানলেই চলবে।
তবে বর্তমান যুগের ওলামায়ে কেরাম চোখের ড্রপের ব্যাপারে দুই রকম মত প্রকাশ করেছেন:
প্রথম মত: শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায, শাইখ মুহাম্মাদ ইবন উসাইমীন, ওয়াহবা যুহায়লীসহ বর্তমান যুগের অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের নিকট চোখের ড্রপ সাওম ভঙ্গ করবে না।
কারণ চোখের ভেতরে এক ফোটার বেশি তরল পদার্থ ধরে না। আর এই এক ফোটার পরিমাণ খুবই অল্প। কেননা ছোট্ট একটি চামমের ধারণ ক্ষমতা ৫ ঘন সেন্টিমিটার তরল পদার্থ। আর প্রত্যেক ঘন সেন্টিমিটার ১৫ ফোটা সমপরিমাণ। ফলে ছোট্ট একটি চামচে বিদ্যমান তরল পদার্থের ৭৫ ভাগের ১ ভাগ হচ্ছে ১ ফোটা। অন্যভাবে বলা যায়, ১ ফোটা তরল পদার্থের পরিমাণ ০.০৬ ঘন সেন্টিমিটার।
অতএব, যেহেতু প্রমাণিত হলো যে, ১ ফোটার পরিমাণ খুবই সামান্য, সেহেতু তা সাওম ভঙ্গ করবে না। কেননা কুলি করার পরে যতটুকু লাবণ্য মুখের মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, এর পরিমাণ তার চেয়েও কম। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, এই ১ ফোটা তরল পদার্থ ‘অশ্রু ক্ষরণকারী গ্রন্থি’ (ল্যাকরিমাল ডাকট/Lacrimal Duct) দিয়ে অতিক্রমের সময় পুরোটাই শোষিত হয়ে যায়। ফলে তা গলনালী পর্যন্ত পৌঁছে না। তবে মুখে যে স্বাদ অনুভূত হয়, তা ঐ তরল পদার্থ গলনালী পর্যন্ত পৌঁছার কারণে নয়; বরং জিহ্বার কারণে। কেননা একমাত্র জিহ্বাই হচ্ছে মানবদেহেরে স্বাদ আস্বাদন যন্ত্র। আর তরল ঐ বিন্দু যখন শোষিত হয়, তখন তা জিহ্বার স্বাদ আস্বাদনের এলাকায় চলে যায়। ফলে রোগী স্বাদ অনুভব করে।
আরো একটি বিষয় হচ্ছে, চোখের ড্রপের ব্যাপারে শরী‘আতের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তাছাড়া চোখ পানাহারের কোনো রাস্তাও নয়। যেমন, যদি কেউ তার দুই পায়ের পাতায় কোনো কিছু মাখায় এবং মুখে তার স্বাদ অনুভব করে, তাহলে তা তার সাওম ভাঙ্গবে না। কেননা তা পানাহারের রাস্তা নয়।
দ্বিতীয় মত: চোখের ড্রপ সাওম ভাঙ্গবে। এই মতাবলম্বীরা চোখের ড্রপকে সুরমার ওপর ক্বিয়াস করেছেন। সুরমা যেমন কণ্ঠনালীতে গেলে সাওম ভেঙ্গে যায়, তেমনি চোখের ড্রপও কণ্ঠনালীতে গেলে সাওম ভেঙ্গে যাবে। তাছাড়া অঙ্গব্যবচ্ছেদ বিশেষজ্ঞরা (Anatomist) প্রমাণ করেছেন যে, মহান আল্লাহ এমন নালীর সমন্বয়ে চোখ সৃষ্টি করেছেন, যার সাথে নাকের, অতঃপর গলনালীর সম্পর্ক রয়েছে।

জিহ্বার নিচে যে ট্যাবলেট রাখা হয়, সাওম পালনকারীর জন্য তা ব্যবহারের বিধান

বিবরণ: জিহ্বার নিচে ঔষধ রাখলে, শরীর তা সবচেয়ে দ্রুতগতিতে টেনে নেয়। সেজন্য হৃদরোগীদের জন্য বিশেষ ট্যাবলেট তৈরী করা হয়, যা ‘অ্যানজাইনা পেকটারিস’ (Angina pectoris) নামক হৃদরোগ এবং হার্টে রক্তের জমাটবদ্ধতা (Thrombosis/থ্রমবোসিস) প্রশমন করে। রোগী জিহ্বার নীচে এই ট্যাবলেট রাখা মাত্র খুব অল্প সময়েই দেহ তা টেনে নেয় এবং রক্তের মাধ্যমে হার্টে পৌঁছে যায়। আর এই ট্যাবলেটের কোনো অংশই পেটে প্রবেশ করে না। এক্ষণে রামাযানের দিবসে এই ট্যাবলেট ব্যবহারের হুকুম কী?
হুকুম: এই ট্যাবলেটের গলিত অংশকে কণ্ঠনালীতে পৌঁছা রোধ করলে তা সাওম ভঙ্গ করবে না। কেননা একদিকে যেমন এর কোনো অংশ পেট পর্যন্ত যায় না, তেমনি তা খাদ্য বা পানীয়ও নয়।

খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ ইনজেকশন সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনাঃ

বিবরণ: কিছু কিছু রোগীকে ইনজেকশনের মাধ্যমে খাবার দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। গ্লুকোজ, লবন ও পানির সমন্বয়ে এটি প্রস্তুত করা হয়। কখনও কখনও এতে ঔষধি উপাদানও যুক্ত করা হয়। রোগীর শিরায় এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। ফলে, তা পাকস্থলীতে না যেয়ে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে। কিন্তু তা পানাহারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকে। সেজন্য, রোগী কোনো প্রকার পানাহার না করে শুধু এর ওপর নির্ভর করেই লম্বা সময় বেঁচে থাকতে পারে। এক্ষণে এসব খাদ্যগুণ সমৃদ্ধ ইনজেকশন কি সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে?
হুকুম: এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের দুই ধরণের মত পাওয়া যায়:
প্রথম মত: এই ইনজেকশন সাওম ভঙ্গ করবে। শাইখ আব্দুর রহমান সা‘দী, শাইখ ইবন বায, শাইখ মুহাম্মাদ উসাইমীনসহ আধুনিক যুগের বেশিরভাগ আলিম এই মত অবলম্বন করেছেন। ‘আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমী’-ও এই মত সমর্থন করেছে।
তাদের দলীল হচ্ছে, যেহেতু এই ইনজেকশন খাদ্যের কাজ করে, সেহেতু তা সাওম ভঙ্গ করবে।
দ্বিতীয় মত: কতিপয় আলিমের মতে, এই ইনজেকশন সাওম ভঙ্গ করবে না।
তাদের দলীল হচ্ছে, যেহেতু এর কোনো অংশই স্বাভাবিক প্রবেশ পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে না, সেহেতু তা সাওম ভঙ্গ করবে না। আর ভেতরে কিছু অংশ গেলেও তা যায় মানবদেহের কূপ দিয়ে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ভেতরে যে অংশ যায়, তা পেট পর্যন্ত পৌঁছে না।

ঔষধি ইনজেকশন সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনাঃ

বিবরণ: খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ ইনজেকশন ছাড়া অন্যান্য যেসব ইনজেকশন বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেগুলোই ঔষধি ইনজেকশন। এগুলো কখনও চামড়ায় দেওয়া হয়; যেমন, ইনসুলিন। আবার কখনও মাংসপেশী বা শিরায় দেওয়া হয়। এসব ইনজেকশন পাকস্থলী পর্যন্ত যায় না। এক্ষণে সাওমে এর কী ধরণের প্রভাব রয়েছে?
হুকুম: আধুনিক কালের প্রায় সকল আলিমের মতে, উল্লিখিত ইনজেকশন সাওম ভঙ্গ করবে না। ‘আন্তর্জাতিক ফিক্বহ একাডেমী’, সঊদী আরবের ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ লিল-বুহূছ আল-ইলমিইয়া ওয়াল-ইফতা’ এবং ‘দারুল ইফতা আল-মিছরিইয়া’-ও এই ফাতওয়া দিয়েছে।
তারা বলেন, এসব ইনজেকশন খাদ্য, পানীয় বা এ জাতীয় কোনো কিছু নয় বলে সেগুলো সাওম ভঙ্গ করবে না।

রোজার বিধিবিধান ১ম পর্ব

রোজার বিধিবিধান ২য় পর্ব

   রোজার বিধিবিধান ৩য় পর্ব

   রোজার বিধিবিধান ৪র্থ পর্ব

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *