রোজার বিধিবিধান [পর্ব-০৪] :: রোজা থাকা অবস্থায় কি কি কাজ করা বৈধ ?

রোজা থাকা অবস্থায় রোজাদারের জন্য কি কি কাজ করা বৈধ ?

রোজার বিধিবিধান (পর্ব-০৪)

১। থুথু থেকে বাঁচা দু:সাধ্য। কারন তা মুখে বা গলার
গোড়ায় জমা হয়ে নিচে এমনিতেই চলে যায়। অতএব এতে রোযা নস্ট হবে না। এবং বারবার থুথু ফেলারও দরকার হবে না।
হযরত আতা এবং কাতাদা (রহঃ) বলেন, রোযাদার নিজের থুথু গিলে খেতে পারবে(সহিহ আল বুখারী)।
তবে ইচ্ছাকৃত বেশি পরিমান থুথু জমা করে গিলে ফেলা অনুচিত। যে কফ, গয়ের, শ্লেস্মা বেশি মোটা এবং যা কখনো মানুষের বুক (শ্বাসযন্ত্র) থেকে, অাবার কখনো মাথা (Sinuses) থেকে
বের হয়ে অাসে তা গলা ঝেড়ে বের করে বাইরে ফেলা ওয়াজিব। সতরাং তা গিলে ফেলা বৈধ নয়।
তবে কেউ যদি বাইরে ফেলার চেস্টা করেও ফেলতে না পেরে গিলেই ফেলে তাতে রোযা নস্ট হবে না।[অাশ শারহুল মুমতে]
.
২। রোযাদারের জন্য দিনে ঘুমানো বৈধ। কিন্তু সকল
নামাজ যথাসমায়ে জামাত সহকারে অাদায় করতে
অবহেলা করা যাবে না । প্রয়োজনের বেশি না ঘুমিয়ে বরং কোরান পাঠ, যিকির বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে থাকা উচিত।
দিনের মধ্যে ঘুমিয়ে গেলে অার সেই ঘুমে অনিচ্ছায়
স্বপ্নদোষ হলে তার রোযা নস্ট হবে না। তবে সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা উত্তম।

[ফাসি:মুসনিদ, হেদায়া-১ম খন্ড]
.
৩। ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে রোযা নস্ট হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে ঐ রোযার কাযা করতে হবে ।
তবে বমি সামলাতে না পেরে অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হয়ে গেলে রোযা নস্ট হয় না । রাসুল(সা:) বলেন-“রোযা অবস্থায় যে ব্যক্তি বমিকে দমন
করতে সক্ষম হয় না তার কাযা নেই। পক্ষান্তরে যে
ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করে, সে যেন ঐ রোযার কাযা
করে“ [ অাবু দাউদ,তিরমিজি]
বমি মুখে অাসার পর যদি তা নিজের ইচ্ছায় গিলে
ফেলে তবে রোযা নস্ট হয়ে যাবে ; তাহলে ঐ রোযার
কাযা করতে হবে। [ হেদায়া-১ম খন্ড]
তবে ঢেকুর তুলতে গিয়ে যদি রোযাদারের গলাতে কিছু খাবার উঠে অাসে অথবা খাবারের স্বাদ গলাতে অনুভব করে
এবং তারপরেই ঢোক গিলে নেয় তাতে রোযার কোন
ক্ষতি হয় না। কারন তা অাসলে মুখ পর্যন্ত বের হয়ে অাসে না । বরং গলা পর্যন্ত এসেই তা পেটে নেমে যায়। এবং রোযাদার কেবল গলাতেই খাবারের স্বাদ অনুভব করে; মুখে-জিহবায় নয়।
তাই রোযা নস্ট হবে না । [ অাশ শারহুল মুমতে]
অার যদি ঢেকুরের সাথে খাবার মুখে চলে অাসে এবং গিলে ফেলে তাহলে রোযা নস্ট হবে এবং কাযা
ওয়াজিব হবে।[হেদায়া]
.
৪। রোযা থাকা অবস্থায় অাতর বা অন্য প্রকার সুগন্ধি যা ধুঁয়া যুক্ত নয় তা ব্যবহার করা বৈধ । অার ধুঁয়া জাতীয় সুগন্ধি যেমন-অাগরবাতি, চন্দন ধুঁয়া
ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে ঘ্রান নেয়া বৈধ নয় । কারন এই
শ্রেনীর সুগন্ধির ঘনত্ব অাছে যা পেটে গিয়ে পৌছায় । বলা বাহুল্য রান্নাঘরের যে ধুঁয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাকে
এসে প্রবেশ করে তাতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না ।
কারন তা থেকে বাঁচার উপায় নেই ।
[ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ,ফাসি:মুসনিদ,মাজমু
ফাতাওয়া ]
.
৫। অনিচ্ছাকৃতভাবে মাছি গলায় প্রবেশ করলে অথবা রাস্তার ধুলা রোযাদারের নি:শ্বাসের সাথে পেটে গেলে রোযার কোন ক্ষতি হয় না । ” হযরত হাসান (রাঃ) বলেন, যদি মাছি রোযাদের গলায় চলে যায়, তাতে কোন অসুবিধা হবে না” ।-সহিহ আল বুখারী । তবে যারা চাউল, অাটা-গুড়ো করা মিলে কাজ করে তাদের মুখে কাপড় বেধে কাজ করা উত্তম। [অাহকামুস সাওমি অল ইতিকাফ]
.
৬। দেহের কোন কাটা-ফাটা অঙ্গ থেকে রক্ত ঝরলে
রোযা নস্ট হয় না। অনুরুপ নাক থেকে রক্ত ঝরলেও রোযা নস্ট হয় না।
তদানুরুপ মাথায় বা দেহের অন্য কোন জায়গায় পাথর বা অন্য কিছুর অাঘাতে রক্ত ঝরলে রোযা নস্ট হয় না ।
[মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ]
.
৭। পরীক্ষা করার জন্য কিছু রক্ত দেয়া রোযাদারের জন্য বৈধ। অনুরুপ কোন রোগির প্রান বাঁচানোর উদ্দেশ্যে রক্ত দান করাও বৈধ । [অাহকামুস সাওমি অল-ইতিকাফ]
.
৮। রোযাদারের দাঁত ব্যথার যন্ত্রনায় দাঁত তুলে ফেলা
বৈধ । তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে দাঁত তোলার সময় রক্ত বা ওষধ গলায় নেমে না যায়।   [ফাতাওয়া মুহিম্মাহ]
.
৯। রোযা অবস্থায় বাহ্যিক শরীরের চামড়ায় তেল,মলম, ক্রিম, পাউডার ব্যবহার করা বৈধ ।[ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ]
.
১০। রান্না করতে করতে প্রয়োজনে খাবারের লবন বা মিস্টি সঠিক হয়েছে কি-না তা চেখে দেখা
রোযাদারের জন্য বৈধ। [হেদায়া-১ম খন্ড] “কোন খাদ্য, সির্কা এবং কোন কিছু কিনতে হলে তা
চেখে দেখতে কোন দোষ নেই“ [বুখারি]
অনুরুপভাবে অতি প্রয়োজনে মা তার শিশুর জন্য কোন শক্ত খাবার চিবিয়ে নরম করে দিতে পারবে ।
এ সকল ক্ষেত্রে শর্ত হলো যেন চর্বিত কোন অংশ
রোযাদারের পেটে চলে না যায় । বরং অতি সাবধানতার সাথে কেবল দাঁতে চিবিয়ে এবং জিভে তার স্বাদ চেখে সঙ্গে
সঙ্গে বাইরে ফেলা জরুরী। [ ফিকহুস সুন্নাহ]
.
১১। রোযাদারের জন্য নিজ মাথার চুল বা নাভির নিচের লোম কেটে ফেলা বৈধ। তাতে যদি কোন স্থান কেটে যেয়ে রক্ত বের হয় তাতে রোযার কোন ক্ষতি হয় না । [ মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়্যাহ]

১২। কারো যদি এমন হয় যে ঘুম থেকে উঠে দেখে সেহরির সময় খুব কম; এদিকে ঘুমের মধ্যে তার স্বপ্নদোষ হওয়াতে গোসল করা ফরজ হয়েছে । গোসল করতে গেলে সেহরির সময় শেষ হবে; এক্ষেত্রে প্রথমে সেহরি খাবে তারপর গোসল করবে তাতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না ।
মা অায়েশা [রা:] ও উম্মে সালামাহ [রা:] বলেন-
অাল্লাহর রাসুল[সা:] (কখনো কখনো ) স্ত্রী মিলন করে অপবিত্র অবস্থায় ফজর
হয়ে যেত। তারপর তিনি গোসল করতেন এবং রোযা রাখতেন। [বুখারি, মুসলিম, অাবু দাউদ, তিরমিজি] উক্ত হাদিস থেকে বুঝা গেল যে নাপাক অবস্থায় ফজরের সময় অর্থাৎ সেহরির শেষ সময় পরোও ফরজ গোসল করা যাবে ।
অার যদি সেহরির সময় অনেকক্ষন পাওয়া যায় তাহলে গোসল করে সেহরি খেতে হবে।
.
১৩। রোযাদার ভুলে কিছু খেলে বা পান করলে রোযা নস্ট হয় না। কারন সে রোযার কথা ভুলে গিয়েছিল।
রাসুল(সা:) বলেন-“যে রোযাদার ভুলে গিয়ে পানাহার করে ফেলে; সে যেন তার রোযা পুর্ণ করে নেয়। এ পানাহার তাকে অাল্লাহ করিয়েছেন” [বুখারি, মুসলিম]
.
১৪। পুকুর/নদীর পানিতে নেমে স্বাভাবিকভাবে গোসল করা বৈধ হলেও সাঁতার কেটে খেলা করা/পানিতে ডুব দেয়া মাকরুহ কেননা
তাতে রোযা নস্ট হবার সম্ভাবনা রয়েছে । কিন্তুু যার
কাজই হলো ডুবুরীর অথবা প্রয়োজনের
তাগিদে বারবার পানিতে ডুব দিতে হয়, সে ব্যক্তি পেটে পানি পৌছানো থেকে সাবধান থাকতে পারলে তার রোযার কোন ক্ষতি হবে না।            [মাসঅালায় ফিস-সিয়াম]
.
১৫। রোযাদার যদি দাঁতের ফাঁকে অাটকে থাকা গোশত বা অন্য খাদ্য ভক্ষন করে তবে এ খাদ্যের পরিমান যদি ১টা সোলা (বুট) এর চেয়ে কম হয় তবে রোযা নস্ট হবে না । অার যদি খাদ্যের পরিমান ১টা সোলা(বুট) এর সমান হলে
রোযা নস্ট হবে। [ হেদায়া-১ম খন্ড]
.
১৬। অধিক গরমের তাড়নায় মাথায় পানি ঢালা বৈধ । অাবু বকর বিন অাব্দুর রহমান [রা:] বলেন- অামি রাসুল [সা:] কে দেখেছি তিনি রোযা রেখে গরমের কারনে নিজ মাথায় পানি ঢেলেছেন।                 [অাবু দাউদ, মুঅাত্তা]
তবে কিছুক্ষন পর পর অর্থাৎ বারবার করা উচিৎ নয় ।
.
১৭। মিসওয়াক বা দাঁতন করা রোযা থাকা অবস্থায়ও সুন্নত; রোযা না থাকা অবস্থায়ও সুন্নত ।
রাসুল [সা:] বলেন-“মিসওয়াক করায় রয়েছে মুখের
পবিত্রতা এবং প্রতিপালক অাল্লাহরসন্তুুস্টি“             [ মুসনাদে অাহমাদ,নাসাঈ]
রাসুল [সা:] বলেন-“অামি উম্মতের জন্য কস্টকর না জানলে তাদেরকে প্রত্যেক নামাজের সময় মিসওয়াক করতে অাদেশ দিতাম ।               [বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি,অাবু দাউদ]
রোযা অবস্থায় গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা উচিৎ; ব্রাশ-টুথপেস্ট,পাউডার,কয়লা দিয়ে করা মাকরুহ কারন তা গলায় নেমে যাওয়ার অাশংকা রয়েছে । তাই টুথপেস্ট রাতে এবং ফজরের অাগে ব্যবহার করা উচিৎ । [মাসঅালায় ফিস-সিয়াম]
দাঁতের মাড়িতে ক্ষত থাকলে অথবা মিসওয়াক করতে গিয়ে রক্ত বের হলে তা গিলে ফেলা বৈধ নয় বরং তা ফেলে দেয়া জরুরী কিন্তুু যদি তা নিজের ইচ্ছা ছাড়াই অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে গলায় নেমে যায় তাহলে রোযার কোন ক্ষতি হবে না ।
[মাসঅালায় ফিস সিয়াম]
.
১৮। রোযা অবস্থায় মহিলাদের জন্য হাতে মেহেদি পায়ে অালতা ব্যবহার করা বৈধ।               [ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ]
১৯। এমন কিছু কর্ম অাছে যা করলে রোযা অসম্পুর্ণ থেকে যায়। এবং রোযার সওয়াবও কম হয়ে যায়। যেমন-মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষি দেয়া, গিবত করা, অশ্লীল কথা বলা।
রাসুল (সা:) বলেন-“ যে ব্যক্তি রোযা থেকে মিথ্যা কথা ও তার উপর অামল ত্যাগ করতে পারল না; সে ব্যক্তির পানাহার ত্যাগ করার মাঝে অাল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই” [বুখারি]

Md Amir

সত্যকে খুঁজে বেড়াই। সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকি। আর তা অন্যদেরকে অনুপ্রেরণা দেবার চেষ্টা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *