কেন মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে ?

কেন মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে? সমস্ত- বিশ্বের ডাক্তারগণকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, মানুষের চক্ষুকে কি কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, তারা সকলেই এক বাক্যে উত্তর দিবেন, হ্যাঁ। এমনি ভাবে মুখ, কান, নাক, হাত, পা, হৃদপিন্ড,ফুসফুস, এমনকি শিরা উপশিরা সর্ম্পকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, এগুলো প্রত্যেকটি সৃষ্টির কি কোন রহস্য রয়েছে তাহলে তারা অবশ্যই উত্তর দিবেন হ্যাঁ। যদি তাদেরকে সেগুলির বিস্তারিত বর্ণনা করতে বলা হয় তাহলে তারা বলবেনঃ মানুষের শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পুংখানু পুংখ রূপে জ্ঞান অর্জন করতে অনেক বছর লেগে যাবে। সাধারণ দৃষ্টিতে আমরা লক্ষ্য করে থাকি যে, মুখ দিয়ে সমস্ত শরীরের জন্য খাওয়ার কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। নাক দিয়ে ঘ্রাণ গ্রহণের কাজ সুসম্পন্ন হচ্ছে। পা দিয়ে হাটার কাজ হচ্ছে। এমনিভাবে প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একটা না একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক অঙ্গের সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। যদি প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সৃষ্টির উদ্দেশ্য থেকে থাকে তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারেনা কি যে, মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি? সমস্ত মানব জাতিকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে ?

প্রথমতঃ আল্লাহ তাআলা কোন কিছু অনর্থক সৃষ্টি করেননি। বরং তিনি অনর্থক কোন কিছু করা থেকে পবিত্র।

তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমরা তোমাদেরকে কেবল অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে না? সুতরাং সত্যিকারের মালিক আল্লাহ মহিমান্বিত, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি সম্মানিত ‘আরশের রব”? [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৫-১১৬]

আল্লাহ তাআলা “হিকমত” বা প্রজ্ঞার গুণে গুণান্বিত। তাঁর মহান নামের মধ্যে রয়েছে- “আল-হাকিম” বা প্রজ্ঞাবান। তিনি মহান হিকমত ও সার্বিক কল্যাণের ভিত্তিতে সৃষ্টি করে থাকেন। এ হেকমত কেউ জানে; কেউ জানে না। আল্লাহ বলেন  “আমরা আসমানসমূহ, জমিন এবং এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে তা খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করে নি আমি এ দু’টোকে যথাযথভাবেই সৃষ্টি করেছি, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না”[সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ৩৮-৩৯]

“হা-মীম, এই কিতাব মহা পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট থেকে নাযিলকৃত। আমরা আসমানসমূহ, জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তা যথাযথভাবে ও একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফুরী করে, তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে তা থেকে তারা বিমুখ”। [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ১-৩]

“আমরা আসমান ও জমিন এবং তার মাঝে যা কিছু আছে খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করে নি”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১৬]

দ্বিতীয়তঃ চতুষ্পদ জন্তুর মত শুধু পানাহার ও বংশবৃদ্ধির জন্য আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ মানুষকে সম্মানিত করেছেন। অনেক সৃষ্টির উপর আল্লাহ মানুষকে মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ কুফরিকে গ্রহণ করে নিয়েছে এবং যে মহান উদ্দেশ্যে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেটাকে তারা বেমালুম ভুলে গেছে বা অস্বীকার করেছে। তাদের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে- দুনিয়াকে উপভোগ করা। এদের জীবন চতুষ্পদ জন্তুর জীবনের মত। বরং তারা চতুষ্পদ জন্তুর চেয়ে অধম।

“কিন্তু যারা কুফুরী করে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং তারা আহার করে যেমন চতুষ্পদ জন্তুরা আহার করে। আর জাহান্নামই তাদের বাসস্থান”। [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ১২]

“আর আমরা অবশ্যই সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জিন্ন ও মানুষকে। তাদের রয়েছে অন্তর, তা দ্বারা তারা বুঝে না, তাদের রয়েছে চোখ, তা দ্বরা তারা দেখে না এবং তাদের রয়েছে কান, তা দ্বারা তারা শুনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারা হচ্ছে গাফেল”[সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ১৭৯]

“তাদেরকে ছেড়ে দাও, আহারে ও ভোগে তারা মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে”। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৩]

তৃতীয়তঃ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আসমান-জমিন, জীবন-মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য- কে তাঁর আনুগত্য করে যাতে তাকে পুরস্কৃত করতে পারেন; আর কে তাঁর অবাধ্য হয় যাতে তাকে শাস্তি দিতে পারেন। মানবজাতিকে সৃষ্টি করার প্রধান লক্ষ্য তাকে তাওহিদের নির্দেশ করা এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার আদেশ করা, তার কোনো শরীক নেই, এটাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

“আর আমি জিন্ন ও মানুষকে কেবল এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা কেবল আমার ইবাদত করবে”। [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৩৩]

“আমি প্রত্যেক জাতির নিকট রাসুল প্রেরন করেছি আল্লাহর ইবাদত করার এবং তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেবার জন্য৷” (সূরা, নাহল ১৬:৩৬)

“হে মানব সমাজ!! তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। তাতে আশা করা যায়, তোমরা পরহেযগারীতা অর্জন করতে পারবে।” সূরা বাকারাহ্, আয়াত: ২১)

সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর হক্ হচ্ছে এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করা৷ রাসূল (সঃ) বলেছেন-“বান্দার প্রতি আল্লাহর হক্ হচ্ছে তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না৷” (মুসলিম, ইফাবা/৫০)

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল”[সূরা আল-মুলক, আয়াত: ২]

“মানুষের উপর এমন কিছু সময় অতিবাহিত হয়েছে যখন সে উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, এভাবে যে, তাকে পরীক্ষা করব অতঃপর তাকে করে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছি। এখন সে হয় কৃতজ্ঞ হয়, না হয় অকৃতজ্ঞ হয়”। (সূরা ইনসান ১-৩)

“আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর” [আল-আম্বিয়াঃ ২৫]

“নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৫৯]

“আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৬৫]

“সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতিত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৭৩]

“আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই” [আল-আর’আফঃ ৮৫]

এ থেকেই বোঝা যায়, যে মানুষ সৃষ্ঠির উদ্দেশ্য  তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর এবাদত করা।

“তুমি শীঘ্রই আহলে কিতাব জাতির নিকট উপনীত হতে যাচ্ছ, অতএব যখন তুমি তাদের নিকট যাবে তাদেরকে আহবান জানাও যে তারা যেন সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন ইলাহ নেই, এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। যদি তারা এর দ্বারা তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানাও যে আল্লাহ তাদের ওপর প্রতি দিন ও রাত্রিতে পাঁচটি সালাতকে ফরজ করেছেন, অতঃপর যদি তারা এর দ্বারা তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে জানাও যে আল্লাহ তাদের ওপর সাদাকা বাধ্যতামুলক করেছেন যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গ্রহন করে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হবে, অতঃপর তারা যদি এই ব্যাপারে তোমার আনুগত্য করে তবে তাদেরকে তাদের সম্পদের সর্বোত্তম অংশ গ্রহন করার ব্যাপারে সতর্ক কর আর মজলুমের দুআকে ভয় করতে বল, কেননা নিশ্চয় এর এবং আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই” [বুখারি, মুসলিম]

আল্লাহ মানুষকে তার ইবাদতের জন্য তৈরি করলেও বান্দাকে বুঝতে হবে ইবাদত করা না করার মধ্যে আল্লাহর কিছু আসে যায় না। তিনি মানুষ বা জিনসহ কারও ইবাদতের মুখাপেক্ষী নন।

“এবং মূসা বললেনঃ তোমরা এবং পৃথিবীর সবাই যদি কুফরী কর, তথাপি আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, যাবতীয় গুনের আধার”। সুরাঃ ইবরাহীম, আয়াত ১৪

তবে মানুষ বা জিন ইবাদতের মাধ্যমে স্রষ্টার সন্তুষ্টি বিধান করতে পারে। যেহেতু তাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা সেহেতু সেটি পূরণের মাধ্যমে তারা নিজের কৃতজ্ঞতা তথা নিজের আনুগত্যের পরিচয় দিতে পারে। এ কারণে হজরত আলী (রা.) বলতেন হে আল্লাহ! আমি জাহান্নামের ভয়ে বা জান্নাতের লোভে তোমার ইবাদত করি না, আমি তোমার ইবাদত করি কারণ তুমি ইবাদতের যোগ্য।

আল্লাহই কেবল আমাদের ইবাদতের যোগ্য এ জন্য যে, তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের তিনি প্রতিপালন করেন, আমাদের আহার জোগান। সর্ব ক্ষেত্রেই বান্দা তার মুখাপেক্ষী। আর কোনো সত্তা এ সক্ষমতার অধিকারী নয়। আল্লাহ আমাদের তার ইবাদত করার তৌফিক দান করুন।

 

 

 

 

One thought on “কেন মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে ?

  • March 8, 2018 at 7:11 pm
    Permalink

    দলীল ভিত্তিক পোস্ট। ভালো হয়েছে। ধন্যবাদ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *