কুরবানীর জন্য কে নির্বাচিত হয়েছিল ?

 

ইসলামী আকিদা হচ্ছে—নবী ইব্রাহিম(আ) এর বড় ছেলে ইসমাঈল(আ)কে কুরবানীর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল অর্থাৎ ইসমাঈল(আ) হচ্ছেন ‘জবিহুল্লাহ’।কুরআন দ্বারা এটি প্রমাণিত এবং এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে।অপরদিকে বাইবেল বলে যে, ইব্রাহিম(আ) এর অন্য ছেলে ইসহাক(আ)কে কুরবানীর জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল।বাইবেলের Old Testament(পুরাতন নিয়ম) অংশটি ইহুদি ও খ্রিষ্টান উভয় ধর্মালম্বীদের ধর্মগ্রন্থ।কাজেই এ নিয়ে মুসলিমদের বিশ্বাস এক এবং ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস আরেক।নাস্তিকরা মূলত ইসলামের বিরোধিতা করে এবং অনেক সময়েই অটোমেটিক চয়েস হিসাবে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অবস্থানকে ডিফেন্ড করে। আমরা এখন কুরআন-হাদিস এবং বাইবেল সকল প্রকারের উৎস থেকেই ইব্রাহিম(আ) এর কুরবানীর ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে আলোচনা করব এবং দেখব আসলে কে কুরবানির জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন—ইসমাঈল(আ) নাকি ইসহাক(আ)।
.
কুরআনে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে ইব্রাহিম(আ) এর বড় ছেলে অর্থাৎ ইসমাঈল(আ)কে কুরবানী দেবার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।দেখুনঃ সুরা আস সফফাত ৩৭:৯৯-১১২ । এখানে পুরো কুরবানীর ঘটনা বর্ণণা করার পরে ১১২নং আয়াতে ইসহাক(আ) এর জন্মের কথা বলা হয়েছে।অর্থাৎ ঐ ঘটনার সময়ে ইসহাক(আ) এর জন্মই হয়নি।আরো দেখুন, সুরা হুদ ১১:৬৯-৭১ । এখানে স্পষ্টত বলা হচ্ছে ফেরেশতারা একই সাথে ইব্রাহিম(আ)কে ইসহাক(আ) ও ইয়া’কুব(আ) এর সুসংবাদ দেন।ইসহাক(আ) যদি জবিহুল্লাহ হয়ে থাকেন,তাহলে ইয়া’কুব(আ) এর সংবাদ কিভাবে দেওয়া হবে? তিনি তো কুরবানীই হয়ে যাবেন! তাহলে তো ইব্রাহিম(আ)কে কোন পরীক্ষা করা হল না।পরীক্ষার ফল আগে থেকেই জানা,ইসহাক(আ) বেঁচে যাবেন ও তাঁর ছেলে ইয়া’কুব(আ) নবী হবেন! কুরআন থেকে এভাবে মুসলিম উম্মাহ নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করে ইসমাঈল(আ) হচ্ছেন জবিহুল্লাহ।

খ্রিষ্টান-মিশনারী কিংবা নাস্তিকরা এই বলে জল ঘোলা করে যেঃ কুরআনে কেন সরাসরি নাম বলা হয়নি? আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি যে সরাসরি নাম না বললেও কুরআনে এটা স্পষ্ট যে ইসমাঈল(আ)ই জবিহুল্লাহ।কুরআনে কুরবানীর পুরো ঘটনা উল্লেখ করে(সুরা আস সফফাত ৩৭:৯৯-১১২) জবিহুল্লাহর নাম উহ্য রাখা হয়েছে।ঘটনা বর্ণণা শেষ করার পরে ইসহাক(আ) এর বৃত্তান্ত শুরু করা হয়েছে।এরপর মুসা(আ) ও হারুন(আ) এর বৃত্তান্ত।এ দ্বারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কুরবানীর উদ্যেশ্যে ইসহাক(আ)কে নেওয়া হয়নি বরং বড় ছেলে অর্থাৎ ইসমাঈল(আ)কে নেওয়া হয়েছিল।মুসলিম,ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা একমত যে ইসমাঈল(আ) বড় ছেলে।কুরআন অনেক সময়েই মহিমান্বিত ব্যক্তির নাম উহ্য রেখে বিশেষণ দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে প্রকাশ করা হয়েছে।এটা কুরআনের একটি বর্ণণাভঙ্গি।ইসমাঈল(আ) ছাড়াও ইউনুস(আ) এর নাম উহ্য রেখে এক স্থানে তাঁকে ‘যান নুন'(মাছওয়ালা) বলে উল্লেখ করা হয়েছে[দেখুনঃ সুরা আম্বিয়া ২১:৮৭; ।
.
এবার আমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থ থেকে ঘটনাটি বিশ্লেষণ করব।
ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থ [ইহুদিদের তানাখ, খ্রিষ্টানদের বাইবেলের পুরাতন নিয়ম(Old Testament) অংশের ‘আদিপুস্তক’(Genesis)] ইব্রাহিম(আ) কর্তৃক তাঁর বড় ছেলে ইসমাঈল(আ)কে পারানের(আরবদেশ) মরুভূমিতে রেখে আসার ঘটনাটি বর্ণণা করেছে।
সহীহ বুখারীতেও [৩১২৫ নং হাদিস]
হাদিস এবং আদিপুস্তক(Genesis) এ ব্যাপারে একমত যে—ইসমাঈল(আ)কে যখন পারানের(আরব দেশ) মরুভূমিতে রেখে আসা হয়, তখন তিনি ছিলেন ছোট শিশু।
ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থে ঘটনাটি যেভাবে আছে—-

[ঈশ্বর বললেন] “আমি দাসীর ছেলেটিকেও এক মহা জাতিতে পরিণত করব কারণ সে তোমার বংশধর।” পরদিন সকালে আব্রাহাম[ইব্রাহিম(আ)] কিছু খাবার এবং চামড়ার থলেতে পানি নিলেন এবং হাগারকে(বিবি হাজিরা) দিলেন।তিনি সেগুলোকে তার কোলে তুলে দিলেন এবং ছেলেটির সাথে তাকে পাঠিয়ে দিলেন।তিনি[হাগার/বিবি হাজিরা] চলে গেলেন এবং বেরশেবার মরুভূমিতে ঘুরতে লাগলেন।চামড়ার থলের পানি যখন শেষ হয়ে গেল, তিনি বাচ্চাটিকে ঝোঁপের নিচে রাখলেন।তিনি উঠে গেলেন এবং কাছেই তীর ছোড়ার দূরত্বে গিয়ে বসে পড়লেন।
কারণ তিনি ভাবছিলেন, “আমি বাচ্চাটার মরণ দেখতে পারব না।” তিনি কাছে বসে ছিলেন এবং বাচ্চাটি কাঁদতে শুরু করল।
ঈশ্বর বাচ্চাটির কান্না শুনলেন।ঈশ্বরের স্বর্গদূত স্বর্গ থেকে হাগারকে আহ্বান করলেন, “কী হয়েছে হাগার? ভয় পেয়ো না।ঈশ্বর বাচ্চাটির কান্না শুনতে পেয়েছেন কারণ ও এই স্থানে শুয়ে আছে।
বাচ্চাটিকে তোল এবং কোলে নাও, কারণ আমি তাকে এক মহান জাতিতে পরিনত করব।”
অতঃপর ঈশ্বর তাঁর চোখ খুলে দিলেন এবং তিনি পানির এক কূপ [জমজম কূপ] দেখতে পেলেন। তিনি সেদিকে গেলেন, চামড়ার থলে পানি দিয়ে ভর্তি করলেন এবং বাচ্চাটিকে পানি খাওয়ালেন।ঈশ্বর সেই ছেলেটির সাথে ছিলেন, এবং সে আস্তে আস্তে বড় হল। সে মরুভূমিতে বাস করতে লাগলো এবং একজন তীরন্দাজ হল।সে পারানের মরুভূমিতে থাকতো এবং তার মা মিশরের একটি মেয়ের সাথে তার বিয়ে দিলেন।”
(বাইবেল, আদিপুস্তক(Genesis) ২১:১৩-২১)

কিন্তু ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আদিপুস্তক(Genesis) এর বর্ণণায় এখানে একটা বড়সড় সমস্যা আছে। ২১নং অধ্যায়ে পরিষ্কার বলা হচ্ছে যে ইসমাঈল(আ)কে মরুভূমিতে রেখে আসার সময়ে তিনি এক ছোট শিশু ছিলেন। ঠিক যেভাবে রাসুল(স) এর হাদিসে বলা হয়েছে।
কিন্ত,একটু আগেই,ঐ একই অধ্যায়ে[আদিপুস্তক ২১:৫-১১] বলা হচ্ছে—ইসমাঈল(আ)কে মরুভূমিতে রেখে আসার কারণ ছিল তিনি ইসহাক(আ)কে ভেঙিয়েছিলেন! এ কী করে সম্ভব, যে ছেলে একটা কাউকে ভেঙানোর মত বড়, এক অধ্যায় পরেই সেই ছেলেটি একটি দুধের শিশুতে পরিনত হয় যে পানির জন্য কাঁদে??

“ইসহাকের যখন জন্ম হয়, তখন আব্রাহামের[ইব্রাহিম(আ)] বয়স ১০০বছর। সারা বললেন, “ঈশ্বর আমার মুখে হাসি ফিরিয়ে দিলেন। আর যে এ খবর শুনবে, সেও হাসবে।”
তিনি আরো বললেন, “আব্রাহামকে কেই বা বলতে পেরেছিল যে সারা একসময় বাচ্চা লালনপালন করবে? তারপরেও আমি বৃদ্ধা বয়সে তাঁকে একটা সন্তান এনে দিলাম।”
বাচ্চাটি বড় হল এবং দুধ খাওয়া ছাড়ল। আর যেদিন ইসহাক দুধ খাওয়া ছাড়ল, সেদিন আব্রাহাম এক বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন।
কিন্তু সারা লক্ষ্য করলেন যে, আব্রাহামের মিশরীয় দাসীর ছেলেটি[ইসমাঈল(আ)] ভেঙচি কাটছিলো।
সারা আব্রাহামকে বললেন, “ঐ দাসী আর তার ছেলেটাকে বের করে দাও।কারণ দাসীর ছেলে আমার ছেলে ইসহাকের উত্তরাধিকারের অংশীদার হতে পারে না।”
(আদিপুস্তক(Genesis) ২১:৫-১২)

বাইবেলের বর্ণণামতে ইসমাঈল(আ) ছিলেন ছোট ভাই ইসহাক(আ) এর চেয়ে ১৪ বছরের বড় [দেখুন আদিপুস্তক ১৬:১৬ ও ২১:৫]। ইসহাক(আ)এর দুধ ছাড়াতে ২ বছর লাগার কথা। সেই হিসাবে ইসহাক(আ) এর দুধ ছাড়ানোর ভোজসভার সময়ে ইসমাঈল(আ) এর বয়স ছিল ১৪+২=১৬ বছর। বাইবেলের বর্ণণামতে, ১৬ বছরের ছেলেটিকে ভেংচি কাটার জন্য তার মা-সহ ইব্রাহিম(আ) বের করে দিয়েছিলেন। অথচ বের করে দেবার পরেই আদিপুস্তক(Genesis) ২১:১৩-২১ এর বর্ণণায় ইসমাঈল(আ) দুধের শিশু হয়ে গেলেন!!!
এর অর্থ হচ্ছে—ইসমাঈল(আ) কর্তৃক ভেংচি কাটার ঘটনাটি একটি বানোয়াট ঘটনা। এই ঘটনার কারণেই বাইবেলে এত বড় স্ববিরোধিতা দেখা দিচ্ছে।

মুহাম্মাদ(স) এর হাদিস এবং আদিপুস্তক(Genesis) ২১:১৩-২১ উভয়ের বর্ণণা অনুযায়ী বের করে দেবার সময়ে ইসমাঈল(আ) ছিলেন শিশু। কুরআনের বর্ণণা অনুযায়ী—ইসহাক(আ) এর জন্মের সুসংবাদ দেওয়ারও আগে ইসমাঈল(আ)কে কুরবানী দিতে নিয়ে যাবার ঘটনা ঘটেছিল [দেখুন সুরা আস সফফাত ৩৭:৯৯-১১২]।এর মানে ইসমাঈল(আ)কে মরুভূমিতে রেখে আসার ঘটনাটাও ঘটেছিল ইসহাক(আ) এর জন্মেরও বহু আগে। কাজেই ইসমাঈল(আ) কর্তৃক ইসহাক(আ) এর ভোজসভায় ভেংচি কাটার ঘটনা ঘটবার প্রশ্নই আসে না।

বাইবেলের বর্ণণায়ও দেখা যায় যে ইব্রাহিম(আ)কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাঁর একমাত্র পুত্রকে কুরবানী দিতে নিয়ে যাবার জন্য [দেখুন আদিপুস্তক ২২:২], অথচ নামের জায়গায় ইসহাক(আ) এর নাম। ইসহাক(আ) কখনোই ইব্রাহিম(আ) এর একমাত্র পুত্র ছিলেন না কারণ তিনি ছিলেন তাঁর ২য় ছেলে। কেবলমাত্র বড় ছেলে ইসমাঈল(আ) এরই ইব্রাহিম(আ) এর “একমাত্র পুত্র” হওয়া সম্ভব। ইসহাক(আ) এর জন্মের আগ পর্যন্ত ১৪ বছর ধরে তিনিই ছিলেন ইব্রাহিম(আ) এর “একমাত্র পুত্র”।

প্রকৃতপক্ষে ঝামেলাটা আছে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থে। ইহুদিরা এই ঘটনায় ইসমাঈল(আ) ও ইসহাক(আ) এর নাম অদলবদল করতে গিয়ে ফ্যাকরাটা বাঁধিয়েছে। ইহুদিরা চেয়েছিল কুরবানীর ঘটনায় ইসমাঈল(আ) এর নাম বদলে ইসহাক(আ) এর নাম বসানোর কারণ ইসহাক(আ) তাদের পূর্বপুরুষ। এই কুকাজটা করতে গিয়ে তাদের কিতাবে এই হাস্যকর বৈপরিত্য বা স্ববিরোধিতা দেখা দিয়েছে।

কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে—কুরআন ও হাদিসের বর্ণণায় কোন বৈপরিত্য বা ঝামেলা নেই।বরং ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ তানাখ ও বাইবেলে ইসমাঈল(আ) ও ইসহাক(আ) এর নাম অদল-বদল করে ইসমাঈল(আ)কে কুরবানীর ঘটনা থেকে সরানো এবং ইসমাঈল(আ) এর নামে একটি বানোয়াট ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করবার কারণেই তাদের গ্রন্থে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসের বর্ণণা মেনে নিলে আর এই সমস্যা থাকে না বরং ব্যাপারগুলো খাপে খাপে বসে যায়। অথচ নাস্তিক-মুক্তমনারা অন্ধভাবে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গ্রন্থের বিবরণের উপরেই নির্ভর করে, শুধুমাত্র ইসলামকে ভুল প্রমাণ করার জন্য। অথচ এ দ্বারা তাদের নিজেদের ভুল অবস্থান তো প্রমাণ হলই, ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ধর্মগ্রন্থের বিকৃতিও প্রমাণ হল।আমরা মুসলিমগণ আল্লাহর প্রেরিত পুরুষদের মধ্যে পার্থক্য করি না[সেখুন সুরা বাকারাহ ২:২৮৫], আমরা সকল নবী-রাসুলকেই বিশ্বাস করি ও ভালোবাসি।কুরআন-হাদিসে যদি বলা হত ইসহাক(আ) জবিহুল্লাহ, তাহলে আমরা নির্দ্বিধায় তা মেনে নিতাম।ইসমাঈল(আ) ও ইসহাক(আ) উভয়কেই আমরা ভালোবাসি।কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহ এবং বাইবেল সকল সূত্র থেকেই এটা প্রমাণিত যে ইসমাঈল(আ)ই জবিহুল্লাহ। আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার থেকে রক্ষা করুন।

২১০টি ইসলামি বই ডাউনলোড করুন

 

189 total views, 1 views today

Leave a Reply

Be the First to Comment!

Notify of
avatar
wpDiscuz